বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের শতকরা প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এখনও কোন না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। বিশেষ করে কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামীণ জনপদে ব্যাবসা বা ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটছে তবুও খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতায় কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সার সংকট, কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতায় কৃষিতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে আবার আরেক দফায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। চলতি বছরে তিন ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে কৃষি খাত গভীর সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে।
সবশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে সরকার। এতে ডিজেল ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখেছি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকরা সরকারের সাথে বসে আলাপ-আলোচনা করে গাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। এতে জ্বালানির মূল্য বাড়ায় যে অতিরিক্ত চাপ তা পুরোপুরি যাত্রীদের ঘাড়ে এসে পড়তে মোটেও সময় লাগেনি। কিন্তু সাধারণত দেখা যায়, পরিবহন খাতের পর সবচেয়ে বেশি ডিজেল ব্যবহৃত হয় আমাদের কৃষি খাতে। সেখানে কৃষকরা সদ্য বাড়া জ¦ালানির বাড়তি খরচের বোঝা কোনো ক্রেতা বা ভোক্তার ঘাড়ে চাপাতে পারছে না। অতিরিক্ত এ যাবতীয় খরচ নিজের পকেট থেকে মেটাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন তারা ঋণে জড়িয়ে পড়ছে অন্যদিকে তাদের ফসলের ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এই জায়গা থেকে বের হতে না পারলে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে আমাদের কৃষি খাত। আর কৃষক ও কৃষিকে পিছিয়ে রেখে আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়বে। গ্রামীণ কর্মসংসংস্থানে ধস নামায় আমাদের বেকারত্ব বাড়বে পাশাপাশি খাদ্য সংকট তীব্র আকারে ধারণ করবে।
আমরা দেখেছি, কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি ডিজেল ব্যবহৃত হয় সেচের কাজে। আমাদের দেশে ধান উৎপাদন করতে যে পরিমাণ সেচের প্রয়োজন হয় তার প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া অন্যান্য ফসল উৎপাদনেও ব্যাপক পরিমাণে পানির প্রয়োজন হয়; যা কৃষকরা ডিজেল চালিত ইঞ্জিন দিয়ে চাহিদা মিটিয়ে থাকে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষের জন্য প্রায় ২০ লিটারের মতো ডিজেলের প্রয়োজন হয়। এখন কথা হলো, এ বছরই শুধু কয়েক ধাপে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করে আকাশচুম্বী করে তোলা হয়েছে। এখন ফসলের দামও কি কৃষক কয়েক ধাপে বৃদ্ধি করতে পারবে? সাধারণত, কৃষকের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণে তাদের কোনো হাত থাকে না। ফলে তারা চাইলেও এসব পণ্যের দাম বাড়াতে পারে না। দিনশেষে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে ফসল উৎপাদনের জন্য জমি প্রস্তুত করতে হয়। এতে পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষাবাদ করা লাগে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে চাষাবাদেও বড় অঙ্কের খরচ পড়ে যাচ্ছে। যা অনেকটা কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ফসল জমি থেকে সংগ্রহ করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত পরিবহন খরচের যে অতিরিক্ত ভাড়া যুক্ত হয়েছে তাতেও কৃষক হিমশিম খাচ্ছে। বাজারে ক্রেতারা অনেক সময় পণ্যের দাম বেশি দিয়ে কিনলেও; কৃষক তার যথাযথ মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘ একটি সময় ধরে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য সরকারের উচিত সবকিছুর আগে এদেশের কৃষকের স্বার্থের দিকে নজর দেওয়া। যাতে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারে তার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ফসল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে বাড়তি এই অতিরিক্ত চাপ কৃষককে দিনে দিনে দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলছে। ডিজেলের এবং কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি একটা পর্যায়ে গিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। আর বিশেষ করে যেসব কৃষকের নিজস্ব জমিজমা নেই, যারা বর্গা করে কৃষি কাজ পরিচালনা করে থাকে তারাই সবচেয়ে সংকটের মধ্যে পতিত হচ্ছে। এই সংখ্যাও আমাদের দেশে নেহাত কম নয়। একটি সময় বাধ্য হয়ে তারা যদি চাষাবাদ কমিয়ে দেয় বা জমি অনাবাদি রাখে তাহলে একদিকে যেমন আমাদের দেশীয় শস্য উৎপাদন কমে যাবে অন্যদিকে আমদানি নির্ভরতা কয়েকগুণে বৃদ্ধি পাবে। যা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত আনবে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, কৃষকের উন্নয়নে এবং কৃষিকে বাঁচাতে জরুরি সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে কৃষকের সেচ প্রকল্প স্বাভাবিক রাখতে পরিবেশবান্ধব সৌর সেচ পাম্পের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। যাতে বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের বাইরে গিয়ে কৃষক জমিতে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে। যাতে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। এর পাশাপাশি ভর্তুকি মূল্যে ডিজেল সরবরাহের লক্ষ্যে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে যাতে ডিজেলের সংকট তৈরি না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। সরকারের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় কৃষি ডিজেল-কার্ড করা যায় কিনা সেটা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। কৃষি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কৃষকরা যেন সহজ শর্তে কৃষিঋণ পায় সেদিকে খেয়াল করা। প্রতিবছর সরকারিভাবে যেসব সার, বীজ কিংবা কৃষি সুযোগ সুবিধা আসে সেগুলো যেন প্রকৃত কৃষকরা পায় তার জন্য মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং বাড়াতে হবে। আশা রাখি, সরকার কৃষি খাত বাঁচাতে অন্ততপক্ষে ডিজেলের সদ্য বর্ধিত মূল্য পুনর্বিবেচনা করবে, কৃষি উপকরণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

